বৈষম্যের অর্থনীতিকে জনমুখে তুলে ধরেছিলেন রেহমান সোবহান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অর্থনীতিবিদদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য, যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁরা তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য জনগণের সামনে তুলে ধরেন। এই প্রক্রিয়ায় যিনি সবচেয়ে সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন, তিনি ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।

১৯৫০ ও ৬০–এর দশকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তথ্যপ্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেন একদল অর্থনীতিবিদ। তাঁদের গবেষণার ভিত্তিতেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শীর্ষক পোস্টার প্রকাশ করে, যা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। তবে এই তত্ত্বকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন রেহমান সোবহান।

১৯৬১ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত এক সেমিনারে রেহমান সোবহান ও নুরুল ইসলাম ‘দুই অর্থনীতি তত্ত্ব’ উপস্থাপন করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের তৎকালীন উপপ্রধান হাবিবুর রহমান। সেমিনারে উপস্থাপিত রেহমান সোবহানের নিবন্ধটি গণমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব পায়। পরদিন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়—‘পাকিস্তানে বর্তমানে দুই অর্থনীতি বিদ্যমান’।

সেই একই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান ঢাকা সফর শেষে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরেন। সেখানে সাংবাদিকেরা তাঁকে দুই অর্থনীতির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাঁর প্রতিক্রিয়াও একই পত্রিকায় বড় করে ছাপা হয়—‘পাকিস্তানের একটাই অর্থনীতি’। রেহমান সোবহানের ভাষায়, একজন ২৬ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বক্তব্যের পাশে একজন শক্তিশালী সামরিক শাসকের বক্তব্য ছাপা হওয়াই প্রমাণ করে, পাকিস্তানের জনমতের গতিপথ বদলাতে শুরু করেছে।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই জনমত গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন রেহমান সোবহান। সে লক্ষ্যে তিনি কামাল হোসেন, হামিদা হোসেন ও জিয়াউল হক টুলুকে সঙ্গে নিয়ে সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ফোরাম’ প্রকাশ করেন। রেহমান সোবহান ছিলেন এর নির্বাহী সম্পাদক এবং হামিদা হোসেন সম্পাদক। ১৯৬৯ সালের ২২ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে উপস্থিত থেকে পুরো বছরের চাঁদা দিয়ে এই পত্রিকার প্রথম গ্রাহক হন।

ফোরাম দ্রুতই জনমত গঠনের কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে। রেহমান সোবহান সেখানে নিবন্ধ লেখার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে প্রতিবেদন করেন এবং পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা যুক্তিসংগতভাবে তুলে ধরেন তিনি। সে সময় পত্রিকাটি প্রকাশের পর নিউ মার্কেট এলাকায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই সব কপি বিক্রি হয়ে যেত বলে জানান অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান।

একই সময়ে শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ছাত্রনেতাদের পাশে দাঁড়ান রেহমান সোবহান। তিনি ছাত্রদের পরামর্শ দিতেন যেন গণআন্দোলনের পথে এমন কোনো কাজ না হয়, যা নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

আজও রেহমান সোবহান লেখালেখি, চিন্তাচর্চা ও জাতীয় আলোচনায় সক্রিয়। জীবনের পুরো সময়জুড়েই তিনি এই দেশের বলে কথা বলেছেন। জাতির যে কোনো সংকটে তাঁর কণ্ঠস্বর এখনো দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হয়।

Check Also

উত্তরায় ছয়তলা আবাসিক ভবনে আগুন: দোতলার ডাইনিং রুম থেকে সূত্রপাত, নিহত ৬

ঢাকা: রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম সেক্টরে একটি ছয়তলা আবাসিক ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।