আবাসন কোম্পানি ‘লেক আইল্যান্ড’–এর দখল ও আগ্রাসনে শেষ হয়ে যাচ্ছে ফুলের রাজ্য
ঢাকার অদূরে সাভারের বিখ্যাত “গোলাপ গ্রাম”—যে গ্রাম একসময় নানারঙের গোলাপে ভরা থাকত—সেটি এখন প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ নামের একটি আবাসন কোম্পানির লাগাতার দখল, মাটি কাটার কাজ এবং খাসজমি দখলের অভিযোগে গোলাপ চাষ ধ্বংসের পথে।
একসময় যেখানে লাল, নীল, বেগুনি, গোলাপি গোলাপের বাগান সাজানো ছিল, সেখানে এখন এক্সক্যাভেটরের শব্দ, জমির গভীর গর্ত এবং ‘প্লট বিক্রি চলছে’ লেখা রঙিন সাইনবোর্ড। হাতেগোনা অল্প কিছু বাগান টিকে থাকলেও পাশের জমিগুলো কেটে ফেলা হওয়ায় সেগুলোও ধ্বংসের মুখে।
দুই হাজার কৃষক পেশা বদলাতে বাধ্য
গোলাপ গ্রামে প্রায় দুই হাজার কৃষক সরাসরি ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু নলকূপ উপড়ে ফেলা, জমির চারপাশে গভীর গর্ত তৈরি, রাস্তা দিয়ে চলাচলে বাধা—এসব কারণে একের পর এক বাগান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পানির অভাবে মরছে ফুলের চারা, কমছে উৎপাদন, বন্ধ হচ্ছে জীবিকা।
অনেকেই বাধ্য হয়ে নামমাত্র দামে জমি বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন।
দখল আর হয়রানির অভিযোগ
স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেন, লেক আইল্যান্ড প্রথমে বাগানের মাঝ দিয়ে রাস্তা তৈরি করে। এরপর রাস্তার দুপাশের কিছু জমি কিনে বাকি জমিগুলো চাষের অযোগ্য করে ফেলে। কেউ জমি দিতে না চাইলে তাদের চলাচলে বাধা, ফুল পরিবহনে সমস্যা, এমনকি হুমকি-ধমকির ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয়দের অভিযোগ—কোম্পানিটির একটি প্রভাবশালী ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। হাকিম ও বারেক নামের দুই ব্যক্তি এ বাহিনী পরিচালনা করছে বলে দাবি চাষিদের।
নদী-জলাশয়ও অস্তিত্ব হারাচ্ছে
গোলাপ গ্রাম কুমার খোদা ও শিশার চর দুই মৌজায় বিস্তৃত। মাঝ দিয়ে প্রবাহিত শিশাচর নদী তুরাগে গিয়ে মেশে। কৃষকরা বর্ষায় জমির পানি নিষ্কাশন ও শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য এই নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
কিন্তু অভিযোগ—আবাসন কোম্পানি নদীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাটি ফেলে ভরাট করে দিয়েছে। জলাশয়ও ভরাট করে প্লট তৈরি করা হচ্ছে।
সরকারি খাসজমিও দখলের অভিযোগ
আমিনবাজার ভূমি অফিসের তথ্যে জানা গেছে—কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ৬.১৫৭৫ একর খাসজমির মধ্যে প্রায় ৪.৯০৭৫ একর বেদখল। এর মধ্যে লেক আইল্যান্ড সরাসরি দখলে নিয়েছে ২.১৫ একর। সেখানে তারা নির্মাণাধীন ভবন, অফিসঘর, পশুপালন কেন্দ্র তৈরি করেছে।
এমনকি সেখানে হরিণ পালনের প্রমাণও পাওয়া গেছে, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রতারণার অভিযোগ: বায়না করে জমি দখল
কৃষকদের অভিযোগ—কোম্পানি প্রথমে সামান্য বায়না নেয়; পরে আর টাকা না দিয়ে পুরো জমি দখল করে নেয়। কেউ বিরোধিতা করলে গভীর গর্ত তৈরি করে জমি নষ্ট করে ফেলা হয়।
কৃষক কাব্বাছ পাহলোয়ান জানান, ২০১৩ সালে ৫০ শতাংশ জমির জন্য কোম্পানি ৫ লাখ টাকা বায়না দেয়। এরপর আর টাকা না দিয়েই পুরো জমি দখল করে নেয়। আদালত কাব্বাছের পক্ষে রায় দিলেও জমি এখনো ফেরত দেয়নি কোম্পানি।
লেক আইল্যান্ডের অবস্থান
পরিচয় গোপন রেখে ক্রেতা সেজে কথা বললে কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তারা জানান—প্লট কাঠাপ্রতি ৯ থেকে ২০ লাখ টাকা। কাগজপত্র “সমস্যাহীন” বলেই দাবি করেন তারা। কৃষিজমিতে আবাসিক প্লট রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা বলেন—“এলাকাটি আরবান ও কৃষি—দুটিই। ঝামেলা হবে না।”
অভিযোগ শুনেও নীরব চেয়ারম্যান
অভিযোগ জানতে চাইলে কোম্পানির চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন শুধু বলেন:
“অভিযোগ থাকলে রিপোর্ট করে দিন, সমস্যা নেই।”
kalchitro.com সত্য প্রকাশে সবার আগে প্রতি মুহূর্তে