নিজস্ব প্রতিবেদন | আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫
সুদানের গৃহযুদ্ধের দুই হোতা জেনারেল মোহাম্মদ হামদান ‘হেমেতি’ দাগালো ও জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল–বুরহান।
আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জর্জরিত আফ্রিকার দেশ সুদান। স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র নয়—এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূলে আছে দুই সাবেক মিত্র জেনারেলের ব্যক্তিগত ক্ষমতার লড়াই।
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সেনাপ্রধান জেনারেল বুরহানের নেতৃত্বাধীন সরকারি বাহিনী (এসএএফ) ও আধা–সামরিক বাহিনী আরএসএফ (র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস)-এর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ হামদান ‘হেমেতি’ দাগালো একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত।
দুই বন্ধুর বিবাদ থেকে গৃহযুদ্ধ
২০১৯ সালে একনায়ক ওমর আল–বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে একসঙ্গে ভূমিকা রেখেছিলেন এই দুই জেনারেল। বশির পতনের পর তারা যৌথভাবে অন্তর্বর্তী সামরিক পরিষদ গঠন করেন। কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবরে বেসামরিক সরকার উৎখাত করে আবারও ক্ষমতা দখল করেন তারা।
এরপর থেকেই শুরু হয় অবিশ্বাস ও প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব। জাতিসংঘের নির্দেশে আরএসএফ বাহিনীকে মূল সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা থেকেই ফাটল দেখা দেয় সম্পর্কের। দাগালো মনে করেন, এতে তার বাহিনীর প্রভাব কমে যাবে। ফলেই ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাজধানী খার্তুমে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়।
ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়
জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দেড় কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে এক কোটি মানুষ দেশের ভেতরেই গৃহহীন, বাকি ৩০ লাখের বেশি পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
সুদানের পশ্চিমাঞ্চল দারফুরে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সম্প্রতি ১৮ মাস অবরোধের পর দারফুরের রাজধানী এল–ফাশের দখল নেয় দাগালোর বাহিনী আরএসএফ।
দারফুরে গণহত্যার অভিযোগ
আরএসএফের বিরুদ্ধে সেখানে গণহত্যা, ধর্ষণ এবং বেসামরিক লোকদের ওপর নির্বিচার হামলার অভিযোগ উঠেছে। সুদানের সামাজিক কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সালমা ইশাক জানিয়েছেন, এল–ফাশেরে ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ৩০০ নারীকে হত্যা করা হয়েছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, সেনাবাহিনী ও আরএসএফ—দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। তারা বলেন, দারফুরে আরএসএফ যে নৃশংসতা চালাচ্ছে, তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
এদিকে আরএসএফ দাবি করেছে, তারা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, তবে জাতিসংঘ তাদের এই তদন্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
শান্তির কোনো আলো নেই
বিভিন্ন সময় ২৪ ঘণ্টা, তিন দিন বা এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও কোনো পক্ষের পক্ষেই স্থায়ী বিজয় বা শান্তি আসেনি।
দারফুর ও খার্তুমের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে আজ সুদান বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মুখোমুখি।
দুর্ভিক্ষ, রোগ, নারী নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের স্রোতে দেশটি কার্যত এক “জীবন্ত দুঃস্বপ্নে” পরিণত হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এখন একটাই আহ্বান—
“সুদানে যুদ্ধ থামুক, মানুষ বাঁচুক।”
kalchitro.com সত্য প্রকাশে সবার আগে প্রতি মুহূর্তে