বন্দর চুক্তি নিয়ে অযথা বিতর্ক বন্ধের আহ্বান

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্রম এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে সরকারের চুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে এই চুক্তিকে ঘিরে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ছড়ানো হচ্ছে।

গত ১৭ নভেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার ও এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির পরপরই একটি মহল অভিযোগ তোলে, এর মাধ্যমে দেশের প্রধান বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও উত্থাপন করেন।

তবে সরকার ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে বন্দর বা টার্মিনালের মালিকানা কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে না। সম্পূর্ণ নিজস্ব বিনিয়োগে এপিএম টার্মিনালস নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টার্মিনালটি নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। চুক্তির মেয়াদ শেষে অবকাঠামোসহ সবকিছু রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ জাহাজ জট, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী বন্দর দক্ষতা সূচকেও চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। এর ফলে আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক লজিস্টিক খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটির (পিপিপিএ) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পে সরকারের কোনো আর্থিক বিনিয়োগ নেই। এপিএম টার্মিনালস সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা প্রদান করবে এবং নির্মাণ ও পরিচালনায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অর্থ বা ঋণের ওপর নির্ভর না করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

চুক্তিতে ন্যূনতম কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের শর্ত, পারফরম্যান্স সূচক এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জরিমানা ও চুক্তি বাতিলের বিধানও রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর যুক্ত হলে বন্দরে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্রুত হবে এবং জাহাজ জট কমবে। এতে রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং আমদানির খরচ কমবে। পাশাপাশি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় অবকাঠামো ও পিপিপি প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক বিষয়। অনেক দেশেই এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মত, চট্টগ্রাম বন্দর চুক্তি নিয়ে সমালোচনা ও প্রশ্ন থাকতেই পারে, তবে তা যেন তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল হয়। অযথা বিভ্রান্তি ছড়ালে তা উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তারা আরও বলেন, সঠিক তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের বন্দর খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

Check Also

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।