বাঙালির জীবনে পিঠা শুধু একটি খাবার নয়—এটি শীতের সকাল, মায়ের হাতের আদর, নানির গল্প আর গ্রামবাংলার আবেগের এক অনন্য প্রতীক। হাজার মাইল দূরে প্রবাসের মাটিতেও সেই ঐতিহ্য যে এখনো অটুট, তার উজ্জ্বল প্রমাণ মিলল জার্মানির ফ্রাংকফুর্ট শহরে আয়োজিত পিঠা উৎসবে।
গত শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, জার্মান সরকারের নিবন্ধিত বাংলাদেশি সংগঠন Friends & Family Germany e.V.–এর উদ্যোগে ফ্রাংকফুর্টের গিরিসহাইম এলাকার একটি কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয় পিঠা উৎসব ২০২৬। প্রায় এক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনটি রূপ নেয় গ্রামবাংলার এক প্রাণবন্ত উৎসবে।
শিশুদের আনন্দমুখর কোলাহল, বাঙালি দম্পতিদের ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা এবং রঙিন শাড়ি-পাঞ্জাবিতে ভরে ওঠে পুরো মিলনায়তন। গ্রামীণ অলংকরণ ও লোকজ পরিবেশনা যেন মুহূর্তেই উপস্থিত সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শিকড়ের কাছে।
উৎসবে বাঙালি নারীদের হাতে তৈরি ছিল নানান স্বাদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা। পুলি, পাটিসাপটা, ভাপা পিঠা, দুধচিতই, চিতই, ছিট পিঠা, দুধকুলি, ক্ষীরকুলি, তিলকুলি, নকশি পিঠা, মালপোয়া, মালাই পিঠা, পাকন পিঠা ও ঝাল পিঠাসহ অসংখ্য রকমের পিঠা প্রবাসের মাটিতে তুলে ধরে বাঙালির রসনাবিলাস ও পিঠাশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য।
পিঠা উৎসবকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্নভোজ, সংগঠনের কার্যকরী পরিষদের পরিচিতি পর্ব, শৈশবের স্মৃতিচারণা এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, গল্প আর আড্ডায় যেন ফিরে আসে শীতের সেই পরিচিত সকাল—যেখানে পিঠার গন্ধে ভরে উঠত উঠান।
অনেকেই স্মৃতিতে ফিরে যান মায়ের হাতের পিঠার স্বাদে, কেউ মনে করেন নানির আদরের কথা, কেউবা স্মরণ করেন প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো শীতের দিনের আনন্দ। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এসব মুহূর্ত এনে দেয় এক অনাবিল মানসিক প্রশান্তি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ মো. মানিক মিয়া। যৌথভাবে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কাইয়ুম চৌধুরী ও শ্মিতা মোতালেব। প্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পীদের কণ্ঠে লালনগীতি, রবীন্দ্রসংগীত ও আঞ্চলিক গানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।
এই আয়োজন প্রমাণ করে—ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কখনো মুছে যায় না। দেশের মাটি থেকে বহু দূরে থেকেও পিঠা উৎসবের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আগলে রাখছেন নিজেদের শিকড়, স্মৃতি আর বাঙালিয়ানাকে।
kalchitro.com সত্য প্রকাশে সবার আগে প্রতি মুহূর্তে