ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভিডিও ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে এবং নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে ব্যবহার করা হতে পারে।
গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, এআই–তৈরি কণ্ঠস্বর ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ডিপফেক ব্যবহার করে প্রার্থীদের বক্তব্য বিকৃত করা, ভুয়া ঘোষণা প্রচার এবং মিথ্যা সংবাদ উপস্থাপনের নজির রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডিপফেকের মাধ্যমে এমন ভিডিও তৈরি করা হয়, যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের এমন বক্তব্য দিতে দেখা যায়, যা তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান বা আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অনেক ক্ষেত্রে ভোটের ঠিক আগের রাতে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে কোনো প্রার্থীর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর গুজবও ছড়ানো হয়।
এ ধরনের কনটেন্ট সাধারণত মানুষের আবেগ উসকে দেওয়ার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এখন ‘দেখা মানেই বিশ্বাস’—এই ধারণা আর কার্যকর নেই; বরং ভিডিও দেখলেই সন্দেহ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ডিপফেক শনাক্তের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওতে মুখের আলো-ছায়ার অসামঞ্জস্য, চোখের অস্বাভাবিক নড়াচড়া, ঠোঁটের সঙ্গে কণ্ঠস্বরের মিল না থাকা কিংবা অতিরিক্ত মসৃণ অডিও ডিপফেকের লক্ষণ হতে পারে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্প্রতি জানিয়েছেন, এআই–নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট প্রচলিত নির্বাচনী সহিংসতার চেয়েও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য ডিপফেক ও এআই–তৈরি অপতথ্য মোকাবিলায় একটি কেন্দ্রীয় সেল গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ ও সাইবার নিরাপত্তা ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউএনডিপির নেতৃত্বে ‘ব্যালট’ প্রকল্পের আওতায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, গণমাধ্যমের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
তবে বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ ডিপফেক শনাক্তকরণ টুল বাংলায় কার্যকর নয়। পাশাপাশি দেশীয় ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো জনবল ও অর্থসংকটে ভুগছে, যা দ্রুত যাচাই কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব পরিস্থিতিতে নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক ভিডিও বা পোস্ট দেখলে তা শেয়ার না করে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করা, ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানে পাঠানো এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নির্বাচন কমিশনকে জানানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। সচেতনতা ও দায়িত্বশীল মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমেই এই হুমকি মোকাবিলা সম্ভব।
kalchitro.com সত্য প্রকাশে সবার আগে প্রতি মুহূর্তে