অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত ‘থ্রি জিরো’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—এই তিন লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশে কতটা দায়িত্ব পালন করেছে, তা স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে সরকারের মেয়াদ শেষে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক ‘ক্লিন এনার্জি’ দিবস–২০২৬ উপলক্ষে আজ সোমবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এ দাবি জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। মানববন্ধনে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও পরিবেশবাদী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও সংহতি প্রকাশ করেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘থ্রি জিরো’ ধারণার প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর জাতীয় পর্যায়ে এই তিন লক্ষ্য বাস্তবায়নে কী ধরনের অগ্রগতি হয়েছে, সে বিষয়ে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। তাঁর মতে, সরকার মেয়াদ শেষে শ্বেতপত্র প্রকাশ করলে দেশবাসী বুঝতে পারবে—এই তিনটি বিষয়ে সরকার কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে।
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ‘ক্লিন এনার্জি’ দিবস যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উত্তরণের বিষয়ে সচেতন করা। অথচ এ ক্ষেত্রে সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এ বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত এবং হতাশ বলে জানান। তাঁর ভাষায়, ‘থ্রি জিরোর ধারক–বাহক যাঁর সরকার, সেই সরকারই যদি শূন্য কার্বন নিঃসরণে অগ্রসর হতে না পারে, তাহলে তা অত্যন্ত হতাশাজনক।’
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে শূন্য কার্বন নিঃসরণের ভিত্তি গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। তাঁর প্রশ্ন, সরকার এমন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এগিয়ে নিতে পারত? এই সুযোগ কেন দেশের জনগণ হারাল, সে প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মানববন্ধনে অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি–২০২৫) নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তাঁর অভিযোগ, এই পরিকল্পনা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এতে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণের জন্য সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। তিনি বলেন, এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার দেখিয়েছে যে তারা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করা। ভবিষ্যতে যারা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে, তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি।
মানববন্ধনে টিআইবির ক্লিন এনার্জি প্রজেক্টের সহসমন্বয়ক আশনা ইসলাম টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সুশাসন বিষয়ে একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ‘ক্লিন এনার্জি’ দিবস বিশ্বব্যাপী টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পক্ষে জনমত গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
ধারণাপত্রে টিআইবির পক্ষ থেকে একাধিক সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—ধাপে ধাপে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করা, জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধি, খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে নাগরিক সমাজ ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ, ২০৫০ সালের মধ্যে ‘নেট-জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন।
মানববন্ধনে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, এমআরডিআইসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁরা সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনার সমালোচনা করে অবিলম্বে এই নীতি থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
kalchitro.com সত্য প্রকাশে সবার আগে প্রতি মুহূর্তে