সুন্দরবনের নীরবতা উপভোগ করতে গিয়ে ৫৬ ঘণ্টার এক রুদ্ধশ্বাস দুঃস্বপ্নে আটকে পড়েছিলেন তিনজন। চারদিকে কাদা, লোনাপানি আর শ্বাসমূলের বন—তার ওপর অস্ত্রধারী ডাকাতদের পাহারা, অনাহার ও মৃত্যুভয়। অবশেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মুক্তি মিললেও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আজও তাড়া করে ফেরে অপহৃতদের।
নতুন বছরের প্রথম দিন পাঁচ বন্ধু মিলে সুন্দরবনে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন মো. সোহেল, জাহিদুল ইসলাম, শিহান ইমরান, আলী সরকার ও রুহুল আমিন। ১ জানুয়ারি সকালে তাঁরা মোংলা হয়ে সুন্দরবনঘেঁষা ঢাংমারী খালের একটি রিসোর্টে পৌঁছান। দিনটি কেটে যায় স্বাভাবিক আনন্দেই।
পরদিন ২ জানুয়ারি সকালে নাশতা শেষে নৌকায় করে বনের ভেতরে প্রবেশ করেন তাঁরা। সঙ্গে ছিলেন রিসোর্টের এক পরিচালক ও তাঁর সহকারী। সরু খাল বেয়ে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার পর হঠাৎ তিনজন সশস্ত্র ডাকাত নৌকাটি ঘিরে ফেলে। তাদের হাতে ছিল পাইপগান ও দা।
ডাকাতেরা দ্রুত বুঝিয়ে দেয়, এটি কোনো সাধারণ ছিনতাই নয়। সবাইকে নৌকা থেকে নামিয়ে গভীর বনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মুঠোফোন, টাকা-পয়সা ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। রিসোর্ট পরিচালককে বেঁধে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—চারজনকে ছেড়ে দেওয়া হবে, কিন্তু মো. সোহেল, জাহিদুল ইসলাম ও রিসোর্ট পরিচালককে জিম্মি রাখা হবে মুক্তিপণের জন্য।
এরপর শুরু হয় ভয়াবহ যাত্রা। কাদা, হাঁটুপানি আর ধারালো শ্বাসমূল পেরিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাঁটানো হয় তাঁদের। রাতে আগুন জ্বালিয়ে বসিয়ে রাখা হলেও শীত, ক্ষুধা আর বাঘের ভয় কারও চোখে ঘুম আসতে দেয়নি। সেদিন এক ফোঁটা পানিও জোটেনি, খাবার তো দূরের কথা।
৩ জানুয়ারি সকালে সামান্য খাবার দেওয়া হলেও শুরু হয় মুক্তিপণের চাপ। প্রত্যেক পর্যটকের জন্য পাঁচ লাখ এবং রিসোর্ট পরিচালকের জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা আদায়ের হুমকি দিতে গিয়ে মো. সোহেলকে বন্দুক দিয়ে আঘাত করা হয়। এর মধ্যেই আকাশে ড্রোন উড়তে দেখে ডাকাতেরা আতঙ্কিত হয়ে জিম্মিদের আরও গভীর জঙ্গলে সরিয়ে নেয়।
পরবর্তী রাতটি কাটে চরম আতঙ্কে। গুলির শব্দ, অনাহার আর তৃষ্ণা শরীর ও মন দুটোই ভেঙে দেয়। ৪ জানুয়ারি বিকেলে হঠাৎ ডাকাতসরদার জানায়, তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটি বাঁধ ও খালের কাছে এনে জিম্মিদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। শেষ মুহূর্তে ডাকাতসরদার আবেগে ভেঙে পড়ে, কান্নায় জড়িয়ে ধরে জানায়—তার মাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরে ফেলেছে।
এরপর অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ডাকাতেরা।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কোস্টগার্ডের টহল দলের সঙ্গে দেখা হয় তিন জিম্মির। উদ্ধার শেষে তাঁদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। জানা যায়, পরিবারের পাঠানো সামান্য কিছু অর্থের লেনদেন নজরে রেখেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ডাকাতদের কোণঠাসা করে।
৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে ফিরেছেন তাঁরা।
অপহৃত পর্যটক মো. সোহেল বলেন, “এই তিন দিনে বুঝেছি ভয় কত রকমের হতে পারে—বনের ভয়, অস্ত্রের ভয়, আর সবচেয়ে ভয়ংকর অনিশ্চয়তার ভয়। কখন কী হবে, সেটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ের।”
সুন্দরবনের সেই ৫৬ ঘণ্টা তাঁদের জীবনে এক স্থায়ী আতঙ্কের স্মৃতি হয়ে থাকবে—যা কোনো দিন মুছে যাওয়ার নয়।
kalchitro.com সত্য প্রকাশে সবার আগে প্রতি মুহূর্তে