আট ঘণ্টার বোর্ড বৈঠকে অপ্রত্যাশিত মোড়—হঠাৎ আলোচনায় সাকিব আল হাসান

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালকদের সর্বশেষ বৈঠকটি সময়ের হিসাবে যেমন দীর্ঘ ছিল, তেমনি সিদ্ধান্তের দিক থেকেও ছিল চমকপ্রদ। প্রায় আট ঘণ্টা ধরে চলা ওই বৈঠকের এক ফাঁকে হঠাৎ করেই জাতীয় দলে সাকিব আল হাসানকে ফের বিবেচনায় আনার প্রসঙ্গ ওঠে। বিষয়টি এতটাই আকস্মিক ছিল যে বৈঠকে উপস্থিত অনেক পরিচালকই এতে বিস্মিত হন।

সাধারণত বোর্ড সভায় কোন কোন বিষয় আলোচনায় আসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে এবং পরিচালকদের জানানো হয়। কিন্তু সেদিন সাকিবের প্রসঙ্গটি এজেন্ডায় ছিল না। তবু প্রভাবশালী এক পরিচালক হঠাৎ করেই আলোচনার টেবিলে তোলেন সাকিবকে আবার জাতীয় দলে খেলানোর সম্ভাবনা। তাঁকে সমর্থন করেন আরও দুজন পরিচালক। এতে করে বৈঠকের পরিবেশে একধরনের অস্বস্তি ও কৌতূহল তৈরি হয়।

সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন জানান, পরিচালকদের ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ সিদ্ধান্ত হয়েছে—সাকিব আল হাসান এখন থেকে জাতীয় দলের জন্য বিবেচিত হবেন। তবে এই ঘোষণার সময়ই শুরু হয় নতুন বিতর্ক। কারণ একই বৈঠকে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়া, পরিচালক ইশতিয়াক সাদেকের পদত্যাগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হচ্ছিল। তার মধ্যেই হঠাৎ সাকিব প্রসঙ্গে এমন ঘোষণা অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাকিবের ফর্ম ও ফিটনেস ঠিক থাকলে এবং নির্বাচকেরা চাইলে তাঁকে দলে নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়—যে ভেন্যুতে খেলা হবে, সেখানে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা থাকতে হবে। এই শর্তই আসলে সাকিব ইস্যুর সবচেয়ে বড় জটিলতা সামনে এনে দেয়।

কারণ বাস্তবতা হলো, প্রায় দেড় বছর ধরে সাকিবের বাংলাদেশের মাঠে খেলার ‘সক্ষমতা’ নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি দেশের বাইরে ছিলেন এবং এরপর আর দেশে ফিরতে পারেননি। নৌকা প্রতীকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়া সাকিবের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে হত্যা মামলা, শেয়ার কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাসহ একাধিক অভিযোগ ওঠে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। এই কারণেই জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই কার্যত ‘প্রবাসে’ রয়েছেন তিনি।

সাকিব সর্বশেষ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, ভারতের বিপক্ষে। এরপর অক্টোবরে দেশের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একটি টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার পথেও ছিলেন তিনি। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে মাঝপথ থেকেই ফিরে যেতে হয় তাঁকে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পোস্ট ঘিরেও আলোচনা-সমালোচনা তীব্র হয়।

এই প্রেক্ষাপটে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, সাকিবকে দেশে ফিরতে না দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি আরও মন্তব্য করেছিলেন, সাকিবকে আর বাংলাদেশের পতাকা বহন করতে দেওয়া যাবে না এবং বোর্ডকে এ বিষয়ে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার পদত্যাগের পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এখানেই নতুন প্রশ্ন উঠে—সরকারের অবস্থান কি সাকিব ইস্যুতে বদলেছে? সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়নি। শুধু জানানো হয়েছে, সাকিবের জাতীয় দলে ফেরার পথে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামকে।

বিসিবির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করছে, সাকিবকে নিয়ে এই আলোচনা আসলে নতুন নয়। প্রায় ১০–১২ দিন আগেই বিষয়টি নিয়ে ভাবনা শুরু হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলতে চাওয়ার সিদ্ধান্তের সময় সরকারের সঙ্গে সাকিবকে খেলানোর বিষয়েও যোগাযোগ করা হয়েছিল। বিসিবির ধারণা, কয়েক মাস আগের তুলনায় এখন সরকারের অবস্থান কিছুটা নমনীয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিচালক জানিয়েছেন, সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েই বোর্ড সাকিবকে জাতীয় দলে ফেরানোর প্রসঙ্গ সামনে এনেছে।

সাকিব নিজেও একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি দেশের মাটিতে খেলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে চান। বিসিবিও তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তবে নতুন করে বিসিবির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সাকিবের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রশ্ন উঠেছে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার বিষয়টি আড়াল করতেই কি হঠাৎ সাকিব ইস্যু সামনে আনা হয়েছে? অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিদায় নেবে—এই সময়ের মধ্যে সাকিবের মামলাগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সে প্রশ্নেরও কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, আইনি জটিলতা কাটানো না গেলে সাকিব আদৌ দেশে এসে খেলতে রাজি হবেন কি না। গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামবেন কি? এসব অনিশ্চয়তা কাটেনি এখনো। বিসিবির কয়েকজন পরিচালক অবশ্য দাবি করেছেন, সরকারের বর্তমান দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সাকিবকে খেলানোর বিষয়ে ইতিবাচক এবং তাঁর আইনি জটিলতা সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে এ বিষয়ে এখনো কোনো বক্তব্য আসেনি।

সব মিলিয়ে সাকিব আল হাসান যদি সত্যিই ফেরেন, তাহলে তা নিয়ে ক্রিকেট অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হবে—যা হয়তো কিছুটা হলেও ঝিমিয়ে পড়া বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন আলোচনার জোয়ার আনবে। পাশাপাশি বিশ্বকাপে না খেলার হতাশাও আড়ালে চলে যেতে পারে। ক্রিকেটীয় দিক থেকেও বোর্ড মনে করে, সাদা বলের ক্রিকেটে সাকিব এখনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

বর্তমানে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নিয়মিত খেলছেন সাকিব এবং ফর্ম ও ফিটনেস নিয়ে বোর্ডের বড় কোনো সংশয় নেই। বিসিবির কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়েই তিনি সাম্প্রতিক সব টুর্নামেন্ট খেলেছেন। তবে যদি তিনি ফিরেই জাতীয় দলে খেলেন, সে ক্ষেত্রে ওয়ানডে ক্রিকেটকে অগ্রাধিকার দিতে চাইবে বোর্ড। কারণ ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন নিয়েও বাংলাদেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। র‍্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে থাকতে সাকিবের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটার বড় ভূমিকা রাখতে পারেন—এমন বিশ্বাস বোর্ডের।

কিন্তু সেই সম্ভাবনার আগে এখনো অনেক যদি-কিন্তু পেরোতে হবে—সাকিব আল হাসান ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড—দুজনকেই।

Check Also

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ–আয়ারল্যান্ডের গ্রুপ অদলবদল

ঢাকা: আসন্ন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডের গ্রুপ অদলবদলের সম্ভাবনা আলোচনা খবরে উঠে এসেছে। তবে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।